মাশরাফিকে বিদায়ী উপহার

0
46

অনেক প্রতীক্ষার এই ৪৫ রানের জয়। টানা আট ম্যাচ হারের পর যেটি আসলে মাশরাফি বিন মুর্তজার বিদায়ী উপহার। সেই উপহার পেয়ে মাশরাফির চোখ কি হলো বাষ্পাকুল? কাচঘেরা দূরের প্রেসবক্স থেকে সেটি বোঝা যায়নি।

দলে দুটি বদল ঘটিয়ে বাংলাদেশ কাল খেলতেই নেমেছিল দেহ ভাষায় জয়ের সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা ফুটিয়ে তুলে। দুই ওপেনার ইমরুল কায়েস ও সৌম্য সরকারের ব্যাটে এটির প্রথম রূপায়ণ। সাকিব, সাব্বির, মোসাদ্দেক, মুশফিকের হাত ধরে বাংলাদেশ শেষে পৌঁছে যায় ৯ উইকেটে ১৭৬ রানের সুবর্ণ বন্দরে। ১৯তম ওভারে ‘দুর্ধর্ষ’ লাসিথ মালিঙ্গা হ্যাটট্রিক না করে বসলে বাংলাদেশ হয়তো টি-টোয়েন্টিতে নিজেদের সর্বোচ্চ ইনিংসটাই গড়ে ফেলত। ২০১২ সালে বেলফাস্টে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে করা ৫ উইকেটে ১৯০ রান এখনো হয়ে আছে সর্বোচ্চ।
প্রথমে ব্যাটিং, পরে বোলিং ও ফিল্ডিং—সবখানেই বাংলাদেশ ছিল শ্রেয়তর দল। তবে ম্যাচ শ্রেষ্ঠ সাকিব আল হাসান ছাড়া আর কেউ নন। ইমরুল-সৌম্যর ৬.৩ ওভারে তোলা ৭১ রানের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৬ রানের জুটির অংশীদার তিনি। সাব্বিরের সঙ্গে এই জুটি গড়ার পথে নিজে করেছেন দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ৩৮ রান। পরে তো জাদু দেখিয়েছেন বাঁহাতি স্পিনেও। ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই চাতুর্যের সঙ্গে বোল্ড করে দিয়েছেন আগের ম্যাচে শ্রীলঙ্কার জয়ের নায়ক কুশল পেরেরাকে। ১২ বল পর আরেক ওপেনার দিলশান মুনাবীরা শিকার সাকিবের টার্ন ও বাউন্সের, ১৯ রানে ২ উইকেট হারিয়ে শ্রীলঙ্কা শুরুতেই বিপর্যস্ত। ওভারপ্রতি ৮.৮৫ রান তুলে জয়ের তীরে পৌঁছানো তখনই বেশ কঠিন দেখাচ্ছিল। দলীয় ৪০ রানে অধিনায়ক উপুল থারাঙ্গাকে ফিরে যেতে হয় মাহমুদউল্লাহর অফ স্পিনে। এর পর দৃশ্যপটে আগমন মোস্তাফিজুর রহমানের। ষষ্ঠ ওভারের প্রথম দুই বলে আসেলা গুনারত্নে ও মিলিন্দা সিরিবর্ধনেকে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন বাঁহাতি পেসার। হ্যাটট্রিক বলটি অবশ্য ঠেকাতে পেরেছেন থিসারা পেরেরা। কিন্তু তাতে আর কী এসে গেছে! ৪.৫ থেকে ৫.২ ওভার—চার বলের মধ্যে ৩ উইকেট হারিয়ে শ্রীলঙ্কা তখন ৫ উইকেটে ৪০। এখান থেকে ম্যাচ বের করতে হলে থিসারা কিংবা চামারা কাপুগেদারার ব্যাটে দরকার ছিল ভারত মহাসাগরে নতুন এক সুনামি তোলা ব্যাটিং। ওঁরা দুজন একটু চেষ্টা করেছিলেন, ষষ্ঠ উইকেটে সর্বোচ্চ ৫৮ রানের জুটিও গড়লেন। কিন্তু ওঁদের বিচ্ছিন্ন করতে এলেন সেই সাকিব। থিসারাকে স্টাম্পিংয়ের ফাঁদে ফেললেন মুশফিকের হাতে। এখান থেকে ১৩১ রানে শ্রীলঙ্কাকে অলআউট করতে বাংলাদেশ নিয়েছে আর মাত্র ৫.১ ওভার। সাকিবের ৩ উইকেট, কাটার-স্লোয়ারের পসরা বসিয়ে মোস্তাফিজ নিয়েছেন ৪ উইকেট। বিদায় বেলায় শূন্য হাতে ফেরেননি মাশরাফি, তাঁর শিকার সেকুগে প্রসন্ন। দ্বিতীয় ম্যাচে এসে প্রথম উইকেটের স্বাদ পেয়েছেন সাইফউদ্দিন।
আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে নিজের শেষ টসটা জিতলেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। আর বিদায়ী অধিনায়ককে জয় উপহার দেওয়ার প্রথম তাগিদটা দেখানো শুরু করলেন যেন ইমরুল কায়েস। লাসিথ মালিঙ্গা প্রথম ওভারটি এদিনও শুরু করেছিলেন সমীহ জাগিয়ে, প্রথম তিনটি বলে রান নেই। পঞ্চম বলে পয়েন্টের ওপর দিয়ে তুলে চার মারলেন সৌম্য সরকার। এটি জাগিয়ে দিল যেন ইমরুলকে। নুয়ান কুলাসেকারাকে এক্সট্রা কভার দিয়ে পর পর দুই চার মারলেন পিঠের চোটে আক্রান্ত তামিমের বদলি ওপেনার। ইমরুলই ছিলেন বেশি আক্রমণাত্মক, পরে তাঁর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামেন সৌম্য। ভিকুম সঞ্জয়ের করা চতুর্থ ওভারে তাঁরা তুললেন ১৮ রান, দুজনেরই একটি করে ছক্কা, সৌম্যর এক চার। ৫ ওভারে উঠল ৫৬ রান। ব্যাটসম্যানদের শরীরী ভাষায় তখন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। এ তো স্বপ্নের মতো শুরু! কিন্তু এটাও ঠিক বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে স্বপ্নের পাশে থাকে দুঃস্বপ্ন, সুখের মধ্যে অসুখ। বাংলাদেশের উইকেট পতন শুরু হলে আর থামে না। পড়ে জোড়ায় জোড়ায়। কখনো হয় হ্যাটট্রিক!
মন্থর গতির অফকাটারে সৌম্য আসেলা গুনারত্নেকে ফিরতি ক্যাচ দিয়ে ভাঙলেন ৭১ রানের জুটি। ৮ বল আর ৮ রানের ব্যবধানে অসম্ভব একটা সিঙ্গেল নিতে গিয়ে রানআউট ইমরুল। ২৫ বলে ৩৬ করে গেছেন চারটি চার ও এক ছক্কায়। তৃতীয় উইকেটে সাব্বির-সাকিবের গড়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৬ রানের জুটিটি ভেঙেছে সাব্বিরের বিদায়ে। ভিকুম সঞ্জয়ার একটু দেরিতে সুইং করা বলে বোল্ড সাব্বির। মোসাদ্দেকের সঙ্গে ১৫ রানের জুটি গড়ে আউট সাকিব। কুলাসেকারার স্টাম্প সোজা বল স্কুপ করতে গিয়ে বোল্ড হলেও সর্বোচ্চ চারটি চারে সাজানো ৩৮ রানের ব্যক্তিগত ইনিংসটি তাঁরই। তবে সেকুগে প্রসন্নর একই ওভারে দুবার জীবন পেয়েও ইনিংসটা বড় করতে না পারা তাঁর জন্য নিশ্চয়ই হতাশার।
১৯তম ওভারে মালিঙ্গার স্টাম্প সোজা এক মন্থর অফকাটারে বোল্ড মুশফিক। পরের টানা দুই বলে মাশরাফি ও মেহেদী হাসান মিরাজকে আউট করে হ্যাটট্রিক পূর্ণ মালিঙ্গার। ক্যারিয়ারের শেষ আন্তর্জাতিক টোয়েন্টিতে প্রথম বলে শূন্য রানে আউট মাশরাফি, টি-টোয়েন্টি অভিষেকে মিরাজও প্রথম বলে শূন্য। ওয়ানডেতে তিনটি হ্যাটট্রিক আছে মালিঙ্গার, আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে এটিই তাঁর প্রথম। মালিঙ্গার ওই ওভারের তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম বলে ৩ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ তুলতে পারে মাত্র ৪ রান। শেষ ওভারে মাহমুদউল্লাহ ও সাইফউদ্দিন ৬ রান যোগ করে দলকে পৌঁছে দেন ১৭৬ রানে। শেষ পর্যন্ত এই রানটাই দূরতিক্রম্য থেকে গেছে শ্রীলঙ্কার কাছে।
টেস্ট সিরিজ ১-১, ওয়ানডে সিরিজও ১-১, টি-টোয়েন্টি সিরিজেও অন্যথা হলো না। কোনো সিরিজেই জয় নেই, তবু বাংলাদেশের কাছে ‘১’ সংখ্যাটি আগামী বহুদিন পর্যন্ত অন্য রকম এক সুবাস ছড়াবে। কারণ এর মধ্যেও থেকে গেল সামর্থ্যের এক স্বীকৃতি।

বাংলাদেশ: ২০ ওভারে ১৭৬/৯
শ্রীলঙ্কা: ১৮ ওভারে ১৩১
ফল: বাংলাদেশ ৪৫ রানে জয়ী

একটি উত্তর দিন